তিনি আকাশ হতে বৃষ্টিপাত করেন, ফলে উপত্যকাসমূহ তাদের পরিমান অনুযায়ী প্লাবিত হয় এবং প্লাবন তার উপরের আবর্জনা বহন করে। এরূপে আবর্জনা উপরিভাগে আসে যখন অলংকার বা তৈজসপত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে কিছু আগুনে উত্তপ্ত করা হয় [১]। এভাবে আল্লাহ্ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন। যা আবর্জনা তা ফেলে দেয়া হয় এবং যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিতে থেকে যায়। এভাবে আল্লাহ্ উপমা দিয়ে থাকেন [২]।— الترجمة البنغالية
[১] অর্থাৎ নির্ভেজাল ধাতু গলিয়ে কাজে লাগাবার জন্য স্বর্ণকারের চুলা গরম করা হয়। কিন্তু যখনই এ কাজ করা হয় তখনই অবশ্যি ময়লা আর্বজনা ওপরে ভেসে ওঠে এবং এমনভাবে তা ঘূর্ণিত হতে থাকে যাতে কিছুক্ষণ পর্যন্ত উপরিভাগে শুধু আর্বজনারাশিই দৃষ্টিগোচর হতে থাকে।
[২] এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা মূলত দু’টি উদাহরণ পেশ করেছেন। একটি পানির, অপরটি আগুনের। এ দু’টি উদাহরণে আল্লাহ্ তা’আলা হক্ব যে স্থায়ী এবং বাতিল যে ক্ষণস্থায়ী তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। উদাহরণ দু’টির মধ্যে প্রথমটি হল, আল্লাহ্ তা’আলা যখন আকাশ হতে বৃষ্টিপাত করেন তখন উপত্যকাসমূহ তাদের নিজের পরিমাণ অনুযায়ী পানি ধারণ করে। যদি উপত্যকাটি বড় হয়, তবে বেশী পানি ধারণ করে। আর যদি ছোট হয় তবে তার নিজের পরিমাণ অনুযায়ী পানি ধারণ করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ওহীর মাধ্যমে যে জ্ঞান নাযিল করা হয়েছিল এ উপমায় তাকে বৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর ঈমানদার, সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ স্বাভাবিক বৃত্তির অধিকারী মানুষদেরকে এমনসব নদীনালার সাথে তুলনা করা হয়েছে যেগুলো নিজ নিজ ধারণক্ষমতা অনুযায়ী রহমতের বৃষ্টি ধারায় নিজেদেরকে পরিপূর্ণ করে প্রবাহিত হতে থাকে। তাদের মধ্যে জ্ঞানের তারতম্য আছে। একজনের মনে অনেক জ্ঞান ধারণ করে। আরেক জনের মন বেশী জ্ঞান ধারণ করতে পারে না। অন্যদিকে সত্য অস্বীকারকারী ও সত্য বিরোধীরা ইসলামের বিরুদ্ধে যে হৈ-হাংগামা ও উপদ্রব সৃষ্টি করেছিল তাকে এমন ফেনা ও আবর্জনারাশির সাথে তুলনা করা হয়েছে যা হামেশা বন্যা হবার সাথে সাথেই পানির উপরিভাগে উঠে আসতে থাকে। প্লাবন তার উপরে আবর্জনা বহন করে বলে এ কথাই বুঝানো হয়েছে। এগুলো মূলতঃ সন্দেহ ও কুপ্রবৃত্তির সমষ্টি। হকের সাথে এগুলোও মানুষের মনে প্রবেশ করে মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রতারিত করতে চায় কিন্তু অন্তরের আল্লাহ্র ওহীর পরিমাণ অনুসারে দ্রুত অথবা ধীরে ধীরে তারা তাদের ঈমানী জোরে সে সমস্ত সন্দেহ ও কুপ্রবৃত্তিকে দূরীভূত করে দিতে পারে। তখন শুধুমাত্র ঈমান বাকী থাকে। আর যা কুফরী ও সন্দেহ সেগুলো অপসৃত হয়ে যায়।
দ্বিতীয় উদাহরণটি হল, আগুণে পুড়ে খাঁটি হওয়ার উদাহরণ। সোনা, রূপা এবং এ জাতীয় ধাতব বস্তু যখনই পোড়ানো হয় তখন তার মধ্যস্থিত যাবতীয় ময়লা ও খাদ আলাদা হয়ে যায়। শুধু খাঁটি অংশই বাকী থাকে। তেমনিভাবে ঈমান যখন মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে তখন যৎসামান্য তাতে ময়লা-আবর্জনা সহ অবস্থান করতে থাকে। তারপর ঈমান ও দলীল-প্রমাণাদি পরপর তার কাছে আসতে থাকে। ধীরে ধীরে তার সমস্ত সন্দেহ ও কুপ্রবৃত্তি দূরীভূত হয়ে সে খাঁটি হয়ে যায়। তার মনে আর কোন পংকিলতা স্থান পায় না।
এ দু’টি উদাহরণের আরেকটি দিক হলো, আল্লাহ্র দরবারে যতক্ষণ কোন আমল খাঁটিভাবে তাঁর উদ্দেশ্যে না হবে ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। যতক্ষণ সন্দেহ ও কুপ্রবৃত্তির তাড়না থাকবে ততক্ষণ তা দূর করার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। [ইবন কাসীর; অনুরূপ আরও দেখুন, ইবনুল কাইয়্যেম, ই’লামুল মুওয়াকে’য়ীনঃ ১/১১৭; ইগাসাতুল লাহফানঃ ১/২১; আল-আমসাল ফিল কুরআনঃ ১১]
১৭. আল্লাহ তা‘আলা বাতিলের নিঃশেষ হওয়া এবং সত্যের টিকে থাকাকে আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়া বৃষ্টির পানির সাথে তুলনা করেছেন। যা উপত্যকাগুলোকে ভাসিয়ে দিয়েছে প্রত্যেকটির ছোট-বড় পরিমাপ অনুযায়ী। ফলে পানির উপর উঁচু হয়ে ঢলের ফেনা ও খড়কুটো একত্রিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা এগুলোর দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত দিয়েছেন সেই দামী ধাতুগুলোর সাথে যেগুলোকে গলিয়ে মানুষের অলঙ্কার বানানোর জন্য সেগুলোকে আগুনে জ্বালানো হয়। এ দু’টি দৃষ্টান্তের ন্যায় আল্লাহ তা‘আলা হক ও বাতিলের আরো দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন। মূলতঃ বাতিল হলো পানির উপর ভেসে যাওয়া ফেনা ও খড়কুটো এবং ধাতু গলানোর পর যে মরিচাগুলো সরে যায় সেগুলোর ন্যায়। আর সত্য হলো পরিচ্ছন্ন পানির ন্যায় যা পান করা হয় এবং যা ফলমূল, ঘাস ও তৃণলতা জন্মায়। উপরন্তু তা সেই ধাতুর ন্যায় যা গলানোর পর বাকি রয়েছে। ফলে মানুষ তা কর্তৃক উপকৃত হয়। যেমনিভাবে আল্লাহ তা‘আলা এ দু’টি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন তেমনিভাবে তিনি মানুষের জন্য আরো দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন। যাতে বাতিল থেকে সত্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।— الترجمة البنغالية للمختصر في تفسير القرآن الكريم